ডেনমার্কের সঙ্গে সবুজ অর্থনীতি ও এআই সহযোগিতা গভীর করতে চায় চীন

Pokaa Desk
Pokaa Desk
সবুজ অর্থনীতি


কোপেনহেগেনে রাজা ফ্রেডেরিক দশমের সঙ্গে বৈঠকে ওয়াং ই; সবুজ রূপান্তর, উদ্ভাবন ও জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর বার্তা বেইজিংয়ের


ডেনমার্কের সঙ্গে সবুজ অর্থনীতি, উদ্ভাবন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে সহযোগিতা আরও গভীর করতে চায় চীন। একই সঙ্গে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও বিনিময় বাড়িয়ে পারস্পরিক বন্ধুত্ব জোরদারের কথাও জানিয়েছে বেইজিং। শুক্রবার কোপেনহেগেনে ডেনমার্কের রাজা ফ্রেডেরিক দশমের সঙ্গে বৈঠকে এ কথা বলেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই।



চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিজিটিএনের খবরে বলা হয়, বৈঠকে ওয়াং ই জানান, উদীয়মান খাত—বিশেষ করে সবুজ অর্থনীতি, উদ্ভাবন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়—ডেনমার্কের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে প্রস্তুত চীন। তিনি দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন। ওয়াং ইর ভাষ্য, এসব বিনিময় দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও গভীর করবে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেবে।



চীন-ডেনমার্ক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই বার্তাকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জ্বালানি রূপান্তর, শিল্পের সবুজায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন—এই চারটি ক্ষেত্রই এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। ডেনমার্ক ইউরোপের এমন একটি দেশ, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে বায়ুশক্তি, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, টেকসই নগর পরিকল্পনা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর নীতিতে দীর্ঘদিন ধরে অগ্রণী অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌর ও বায়ুশক্তি, বৈদ্যুতিক যান, ব্যাটারি প্রযুক্তি, গ্রিন ম্যানুফ্যাকচারিং ও সবুজ অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ফলে সবুজ অর্থনীতিতে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়লে তা প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, গবেষণা ও জলবায়ু–সহনশীল উন্নয়নকে নতুন গতি দিতে পারে।



ওয়াং ইর এই সফর কেবল প্রতীকী সৌজন্য সফর নয়; এর পেছনে রয়েছে একটি বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগেই জানিয়েছিল, ২ থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও নরওয়ে সফর করছেন ওয়াং ই। বেইজিংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, সবুজ রূপান্তর, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বিজ্ঞান–প্রযুক্তি সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



ডেনমার্ক সফরের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেনের সঙ্গেও বৈঠক করেন ওয়াং ই। সেই বৈঠকে তিনি বলেন, চীন ডেনমার্কের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ করতে চায়। একই সঙ্গে দুই দেশ সবুজ যৌথ কর্মসূচির নতুন সংস্করণ নিয়ে আলোচনা শুরু করতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। এ ছাড়া বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উদ্ভাবন, সবুজ নৌপরিবহন এবং স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও উল্লেখ করেন তিনি।



চীন-ডেনমার্ক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ‘সবুজ যৌথ কর্মসূচি’ নতুন বিষয় নয়। দুই দেশ এর আগে টেকসই প্রযুক্তি ও সবুজ রূপান্তরকেন্দ্রিক একটি যৌথ কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এখন নতুন সংস্করণ নিয়ে আলোচনার কথা বলছে বেইজিং। এটি বাস্তবায়িত হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, পরিচ্ছন্ন শিল্প, পরিবেশবান্ধব সরবরাহব্যবস্থা এবং নিম্ন-কার্বন পরিবহন ব্যবস্থায় দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সবুজ অর্থনীতি ও এআই—এই দুই খাতকে একসঙ্গে সামনে আনা মোটেই কাকতালীয় নয়। ভবিষ্যৎ অর্থনীতির রূপান্তরে এই দুই ক্ষেত্রকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর শিল্পব্যবস্থা থেকে নিম্ন-কার্বন ও টেকসই উৎপাদন কাঠামোয় যেতে হলে প্রয়োজন নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট গ্রিড, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, পরিচ্ছন্ন পরিবহন ও দক্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা। অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু ডিজিটাল অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, স্বাস্থ্য, নগর পরিকল্পনা, আবহাওয়া বিশ্লেষণ ও জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়নের মতো ক্ষেত্রেও দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।



এই বাস্তবতায় ডেনমার্কের মতো উদ্ভাবননির্ভর একটি দেশের সঙ্গে এআই সহযোগিতা বাড়াতে চাওয়ার অর্থ হলো—চীন ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও সবুজ রূপান্তরকে একই নীতিগত ফ্রেমে দেখতে চাইছে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়, এআই ব্যবহার করে বিদ্যুৎ চাহিদা–জোগানের পূর্বাভাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, বন্দর ও নৌপরিবহনের জ্বালানি সাশ্রয়, শিল্পকারখানায় নির্গমন পর্যবেক্ষণ, এমনকি নগর তাপদ্বীপ বা বন্যার ঝুঁকি বিশ্লেষণ—এসব ক্ষেত্রেই দুই দেশের যৌথ গবেষণা ও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।



চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে ডেনমার্কের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতা আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর ইউরোপে ডেনমার্ককে চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখা হয়। চীনা কর্মকর্তারা বলছেন, ডেনমার্ক ছিল প্রথম নর্ডিক দেশ, যারা চীনের সঙ্গে বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলে এবং সবুজ রূপান্তর–কেন্দ্রিক সহযোগিতা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এবার সেই সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায়—সবুজ অর্থনীতি, বাণিজ্য, গবেষণা ও প্রযুক্তি—পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে বেইজিং।



ডেনমার্কও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে আগ্রহী বলে ইঙ্গিত মিলেছে। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে রাসমুসেন জানান, ডেনমার্ক ‘ওয়ান-চায়না’ নীতিতে অটল রয়েছে এবং সব স্তরে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে চায়। তিনি সবুজ যৌথ কর্মসূচির নতুন সংস্করণ নিয়ে কাজ করা, অর্থনীতি ও বাণিজ্য, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন। তার মতে, অনিশ্চয়তায় ভরা বর্তমান বিশ্বে বড় রাষ্ট্র হিসেবে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ; জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে বেইজিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়াতে চায় কোপেনহেগেন।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীন-ডেনমার্ক সহযোগিতার এই বার্তা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ, জলবায়ু সংকট তীব্রতর হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্প প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রীয় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ইউরোপে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ–পরবর্তী জ্বালানি পুনর্বিন্যাস, শিল্পের ডিকার্বনাইজেশন এবং পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির বাজার নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এ অবস্থায় চীনের মতো বড় উৎপাদক অর্থনীতি এবং ডেনমার্কের মতো সবুজ প্রযুক্তিনির্ভর দেশের সহযোগিতা জলবায়ু কূটনীতির ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।



তবে এই ঘোষণার বাস্তব ফল কতটা হবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী নীতিগত সিদ্ধান্ত, যৌথ কর্মসূচির কাঠামো, বিনিয়োগের মাত্রা, প্রযুক্তি বিনিময়ের বাস্তবতা এবং বৃহত্তর চীন–ইউরোপ সম্পর্কের গতিপথের ওপর। কারণ, একদিকে ইউরোপ চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে যুক্ত, অন্যদিকে প্রযুক্তি নিরাপত্তা, শিল্পনীতি ও ভূরাজনীতির প্রশ্নে সম্পর্ক জটিলও বটে। সেই প্রেক্ষাপটে কোপেনহেগেনে ওয়াং ইর বার্তা মূলত একটি কূটনৈতিক ইঙ্গিত—সবুজ রূপান্তর, উদ্ভাবন ও এআই–কেন্দ্রিক নতুন সহযোগিতার ভাষা দিয়েই ইউরোপে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করতে চাইছে চীন।