দুশানবের শিশুদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের বাড়তি চাপ
তীব্র তাপপ্রবাহ, পানি সংকট ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে তাজিকিস্তানের ২৫ লাখ শিশু
তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবেতে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করছে শিশুরা। গ্রীষ্মকালে টানা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা, পানির ক্রমবর্ধমান সংকট, খরা ও অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে দেশটির প্রায় ২৫ লাখ শিশু এখন বাড়তি ঝুঁকির মুখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু সংকটের প্রভাব শুধু শিশুদের বর্তমান জীবনযাত্রাকেই কঠিন করে তুলছে না; বরং তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানসিক সুস্থতা এবং ভবিষ্যৎ জীবনমানের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে।
মধ্য এশিয়ার পার্বত্য এই দেশটি বরাবরই জলবায়ুগত ঝুঁকির মুখে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও পানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। রাজধানী দুশানবের মতো দ্রুত বিস্তৃত শহরাঞ্চলে এই সংকটের প্রভাব বেশি স্পষ্ট। গ্রীষ্মের দীর্ঘ সময়জুড়ে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠে যাওয়ায় শিশুদের দৈনন্দিন জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে। তীব্র গরমে স্কুলে যাওয়া, বাইরে খেলাধুলা, পর্যাপ্ত পানি পান করা কিংবা নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার মতো মৌলিক বিষয়গুলোও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাজিকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স ১৫ বছরের নিচে। অর্থাৎ দেশটির বড় একটি অংশই শিশু ও কিশোর-কিশোরী। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বহন করার বোঝাও সবচেয়ে বেশি পড়বে এই প্রজন্মের ওপর। বিজ্ঞানীদের তথ্য বলছে, বর্তমানে যারা শিশু, তাদের সারা জীবনজুড়েই আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে হবে। শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হবে পানির অনিশ্চয়তা, খাদ্য নিরাপত্তার চাপ, রোগবালাইয়ের বিস্তার এবং বসবাসযোগ্য পরিবেশের অবনতি।
শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে বেশি থাকে। কারণ তাদের শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাও তুলনামূলক কম। অতিরিক্ত গরমে ডিহাইড্রেশন, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, হিট স্ট্রোক, কিডনি–সংক্রান্ত জটিলতা এবং অপুষ্টিজনিত সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ অনিয়মিত, যেখানে ঘরবাড়িতে পর্যাপ্ত ঠান্ডা পরিবেশ নেই, কিংবা যেখানে স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য নয়— সেসব পরিবারের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে।
দুশানবের মতো শহরে আরেকটি বড় সংকট হলো নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়ার পাশাপাশি বরফগলা পানির উৎস, বৃষ্টিপাতের ধরণ এবং মৌসুমি পানিপ্রবাহের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। মধ্য এশিয়ার অনেক দেশের মতো তাজিকিস্তানেও পানি ব্যবস্থাপনা এখন একটি বড় নীতিগত প্রশ্ন। শহরে জনসংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামো সেই হারে উন্নত হচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিশুদের ওপর— কারণ নিরাপদ পানি না থাকলে ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শিশুদের শিক্ষাজীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তীব্র গরমে শ্রেণিকক্ষে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা কঠিন হয়ে পড়ে, অনেক ক্ষেত্রে স্কুলের অবকাঠামো অতিরিক্ত তাপ সহনশীল নয়, আবার কোথাও কোথাও পানি সংকটও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে। ফলে শিশুদের উপস্থিতি কমে যেতে পারে, মনোযোগে ঘাটতি দেখা দিতে পারে, এমনকি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জলবায়ু সংকট এভাবে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হয়ে থাকে না; এটি ধীরে ধীরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক উন্নয়নের প্রশ্নে পরিণত হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, শিশুদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ সবসময় দৃশ্যমান হয় না। অনেক সময় এর প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। দীর্ঘস্থায়ী গরম, অনিশ্চয়তা, পানির অভাব, পারিবারিক অর্থনৈতিক চাপ বা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ— এসব কারণে শিশুরা মানসিক অস্থিরতা, ক্লান্তি, উদ্বেগ কিংবা আচরণগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে ‘ইকো-অ্যাংজাইটি’ বা পরিবেশগত উদ্বেগের কথা বলা হচ্ছে, মধ্য এশিয়ার শিশুদের ক্ষেত্রেও সেটি ধীরে ধীরে বাস্তব হয়ে উঠছে।
তাজিকিস্তানের মতো দেশে এই সংকটের একটি বড় দিক হলো বৈষম্য। সব শিশু সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। দরিদ্র পরিবার, অনানুষ্ঠানিক বসতিতে থাকা মানুষ, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী শিশু এবং গ্রাম থেকে শহরে আসা নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। কারণ তাদের পক্ষে তাপপ্রবাহ থেকে বাঁচতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া, বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করা বা উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন এখানে সামাজিক বৈষম্যকে আরও গভীর করতে পারে।
এই বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা শিশু-কেন্দ্রিক জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাদের মতে, শুধু সাধারণ পরিবেশ নীতি বা দুর্যোগ মোকাবিলা পরিকল্পনা দিয়ে হবে না; শিশুদের জন্য আলাদা ঝুঁকি মূল্যায়ন, স্কুলভিত্তিক তাপপ্রবাহ ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং নগর পরিকল্পনায় শিশুবান্ধব ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। তাপপ্রবাহের সময় স্কুলের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস, শ্রেণিকক্ষে বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা, স্কুলে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শিশুদের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি— এসব পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় তাজিকিস্তানের সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ— একদিকে তাৎক্ষণিক তাপপ্রবাহ ও পানি সংকট সামাল দেওয়া, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের জন্য বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। কারণ আজকের শিশুরাই এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে গরম আরও বাড়বে, পানির অনিশ্চয়তা আরও তীব্র হবে এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি তাদের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে।
শিশুদের জন্য নিরাপদ, সহনশীল ও স্বাস্থ্যকর নগরজীবন নিশ্চিত করতে হলে জলবায়ু নীতিকে কেবল পরিবেশের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না— এটিকে শিশু অধিকার, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। দুশানবের শিশুদের বর্তমান বাস্তবতা সেই সতর্কবার্তাই নতুন করে সামনে আনছে।

